একটু ধৈর্য ধরে মাথা খাটিয়ে খেললে আরও ১০০ রান করা যেত অনায়াসেই

৩ রানে ২ উইকেট, দুই ওপেনার তামিম ইকবাল (৩) আর অভিষেক হওয়া সাইফ হাসান (০) আউট ম্যাচের ১০ মিনিট না হতেই। সকালের ঐ অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিলো, না জানি কি করুণ অবস্থা হয় টাইগারদের!

আচ্ছা, রান কি ১০০ পার হবে? নাকি ১০০ থেকে ১৫০‘তেই শেষ হয়ে যাবে প্রথম ইনিংস? এমন অনেক শঙ্কা এসে ভর করেছিল। সে শঙ্কা কেটে গেল লাঞ্চের আগেই।

মুুমিনুল হক আর নাজমুল হোসেন শান্ত দাঁতে দাঁত চেপে অনেকটা সময় লড়াই-সংগ্রাম করে শুরুর বিপর্যয় কাটিয়েও দিয়েছিলেন। তাদের দৃঢ়তা দেখে যখন আবার নতুন আশার সঞ্চার ঘটলো সমর্থকদের মনে, ঠিক তার পরপরই আবার আশাভঙ্গের বেদনায় ডোবা। শেষ পর্যন্ত নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে ২৩৩ রানে থেমে যাওয়া।

অমন অনিশ্চিত শুরুর পর ২০০ পেরিয়ে ২৩০‘র ঘরে যাওয়া দেখে কেউ কেউ হয়তো স্বস্তির ঢেঁকুর তুলতে চাইছেন। ভাবছেন-বলছেন, যে রকম অবস্থা ছিল, তাতে এটুকু যে হয়েছে, সেটাই বা কম কি?

কেউ কেউ এমন কথা বলতেই পারেন। কিন্তু সারাদিনের চালচিত্র পাখির চোখে পরখ করলে কিন্তু তা মনে হবে না। বরং স্বস্তি, সন্তুষ্টির বদলে একরাশ হতাশা, রাজ্যের আফসোস আর অনুশোচনাই হবে সঙ্গী।

কেননা শুরুতে অবস্থা যতই নড়বড়ে থাকুক না কেন, একটা সময় ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত যেখানে গিয়ে শেষ হলো প্রথম ইনিসে তার চেয়ে আরও অনেকটা পথ সামনে আগানো যেত। অন্তত আরও ১০০ রান বেশি হতে পারতো।

ভাবার কোনো কারণ নেই যে পাকিস্তানি বোলারদের অসামান্য, বিধ্বংসী বা আগুন ঝরানো বোলিংয়ের কারণে তা নয়। পাকিস্তানিরা আহামরি কোনো বোলিং করেননি। কারো বলই বারুদ মাখানো ছিল না। কেউ আগুন ঝরানো স্পেলও করেননি।

যে দুজনকে নিয়ে বেশি চিন্তা ছিল, তাদের একজন-ইয়াসির শাহ তো (২২ ওভারে ৮৩ রান) উইকেটই পাননি। এই লেগস্পিনারই এ মুহূর্তে পাকিস্তান বোলিংয়ের প্রধান চালিকাশক্তি। আর এক নম্বর পেসার মোহাম্মদ আব্বাস ২ উইকেট পেলেও ‘আনপ্লেয়েবল’ ছিলেন না।

বাঁহাতি দ্রুত গতির বোলার শাহীন শাহ আফ্রিদির নামের পাশে ৪ উইকেট যোগ হলেও তা যতটা তার নিজের বোলিং কারিশমা বা বলের কারুকাজে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাইগারদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ে।

সবচেয়ে পীড়াদায়ক ও দৃষ্টিকটু ছিল অনিয়মিত বাঁহাতি স্পিনার হারিস সোহেলের ২ উইকেট পাওয়া। আগের ১৩ টেস্টে ৯ বার যিনি বোলিংই পাননি, সেই হারিস সোহেল বল করতে এসে সেট ব্যাটসম্যান লিটন দাস আর বাঁহাতি তাইজুল ইসলামকে আউট করেছেন।

টেস্টে টেকনিক, কৌশল আর টেম্পারামেন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘ সময় উইকেটে কাটাতে এবং ইনিংস বড় করতে সবচেয়ে বেশি দরকার ধৈর্য্য। সেশন টু সেশন মাথায় রেখে বলের মেধা ও গুণ বিচার করে খেলা এবং শট নির্বাচন ‘পারফেক্ট’ বা যথাযথ হওয়াও খুবই দরকার।

আজ (শুক্রবার) রাওয়ালপিন্ডি স্টেডিয়ামে সে সত্য হারে হারে উপলব্ধি করেছে টিম বাংলাদেশ। এক নম্বর ওপেনার তামিম ইকবাল আর আজই টেস্ট ক্যাপ পড়া সাইফ হাসান শুরুতে আউট হয়ে যাবার পরও ওয়ানডাউন নাজমুল হোসেন শান্ত, অধিনায়ক মুমিনুল হক, অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, লিটন দাসের সামনে ছিল ইনিংসকে বড় করার অবারিত সুযোগ। তারা সম্ভাবনা তৈরিও করেছিলেন। যাদের কথা বলা হলো তারা সবাই ‘স্টার্ট ’ পেয়েছিলেন। পরিবেশ-পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে থিতুও হয়ে গিয়েছিলেন। একটু বুদ্ধি খাটিয়ে আর ধৈর্য ধরে উইকেটে বেশি সময় থাকার চেষ্টা এবং শট নির্বাচনে দক্ষতার ছাপ রাখতে পারলেই হয়ে যেত।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তারা একজনও তা পারেননি। যে কারণে পুরো ইনিংসে একটি বড় জুটিও গড়ে ওঠেনি। নাজমুল শান্ত আর অধিনায়ক মুুমিনুলের ৫৯ রানের পার্টনারশিপটাই সবচেয়ে লম্বা। এছাড়া মিঠুন আর লিটন দাস ষষ্ঠ উইকেটে তুলে দিয়েছেন ৫৪ রান।

খাদের কিনারায় পড়ে থাকা দলকে টেনে তুলেছিলেন যে দুই বাঁহাতি-শান্ত আর মুমিনুল, অভিজ্ঞ রিয়াদ আর লিটন প্রত্যেকে সেট হয়ে একটা পর্যায়ে গিয়ে একদম আলগা হাতে খেলতে গিয়ে উইকেট বিসর্জন দিয়ে ফিরে এসেছেন। ঐ চারজনের যে কোনো দুজন বড় ইনিংস খেলতে পারলেও বাংলাদেশ ইনিংসের চেহারা ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। হবে কি করে সবাই যে ভুল পথে পা বাড়িয়েছেন।

৩ রানে ২ উইকেট পতনের পর যে দুজন শুরুতে আড়ষ্ট থেকেও ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই শান্ত আর মুমিনুলের জুটি জমে ওঠার পরও ভাঙলো তাদের নিজেদের ভুলে। প্রথম ভুলটা করলেন মুমিনুল। টেস্টে অনেক বড় ইনিংস খেলা মুমিনুল শুরুতে খানিকক্ষণ নিজেকে গুটিয়ে রেখে এক সময় আস্থা ও আত্মবিশ্বাস দুই-ই পেলেন। নিজেকে ফিরে পাওয়াই যেন কাল হলো বাংলাদেশ অধিনায়কের।

৫৯ বলে ৩০ রান করার পর মুমিনুল আউট হলেন পাকিস্তানি ফাস্টবোলার শাহীন শাহ আফ্রিদির অফস্ট্যাম্পের বাইরের বলকে ড্রাইভ করতে গিয়ে। ১১০ বলে ৪৪ করা নাজমুল শান্তও কট বিহাইন্ড। বোলার ছিলেন মোহাম্মদ আব্বাস। বলের পিছনে শরীর ও পা না নিয়ে তিনিও চেষ্টা করলেন পয়েন্টের আশপাশ দিয়ে চালাতে। সেটা ব্যর্থ চেষ্টায় পর্যবাসিত হলো। কিপার রেজওয়ানের গ্লাভসে জমা পড়লো।

একইভাবে অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ চালিয়ে খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে বিদায় নিলেন। ৪৮ বলে ২৫ রান করার পর শাহীন শাহ আফ্রিদির ওয়াইড বলকে তাড়া করতে গেলেন রিয়াদ। ঐ সময়ে অত ঝুঁকি নিয়ে তেড়েফুড়ে মারার কোনোই দরকার ছিল না। ঠান্ডা মাথায় ধৈর্য নিয়ে বলের গুণ বিচার করে খেললেই হয়ে যেত। কিন্তু রিয়াদ তা না করে একটু বেশি চটকদার ও আক্রমনাত্মক শটস খেলতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনলেন। তার অফস্ট্যাস্পের বাইরের শট গিয়ে ধরা পড়লো থার্ড স্লিপে আসাদ শফিকের হাতে।

একই পথে হাঁটলেন লিটন দাসও। অথচ সাজানো গোছানো ব্যাটিংশৈলির লিটনকে দেখে খুবই আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছিলো। অল্প সময় উইকেটে থাকলেও সবচেয়ে আস্থা নিয়ে খেলেছেন। তার কিছু শট দেখে মনে হয়েছে যেন ‘মাখনে ছুড়ি’ চালাচ্ছেন। লিটনের অনসাইডে ফ্লিক দেখে রমিজ রাজার মত ধারাভাষ্যকার প্রশংসায় হলেন পঞ্চমুখ।

কিন্তু পেসারদের অনায়াসে সামাল দিয়ে বাঁহাতি স্পিনার হারিস সোহেলের বলে অহেতুক সুইপ করতে গিয়ে উইকেট দিয়ে এসেছেন লিটন। ৪৬ বলে সাতবার সীমানার ওপারে বল পাঠিয়ে ৩৩ রান করার পর লিটন ফুললেন্থ উইকেট সোজা ডেলিভারিকে সুইপ খেলতে গেলেন আনাড়ির মত। ঐ লাইন আর লেন্থের বাঁহাতি স্পিনকে সুইপ না খেললে কিছুই হতো না। হয়তো রান পেতেন না। তাতে কি হতো? টেস্ট ক্রিকেট তো আর ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি নয়। এখানে সব সময় রানের জন্য খেলার দরকার নেই। পরিবেশ-পরিস্থিতি সামাল দেয়াই আসল কাজ। লিটন তখন রান করার চেয়ে উইকেটে থাকার চেষ্টা করলে তার ইনিংস লম্বা হতো। দলের স্কোর লাইনও হতো বড়।

কিন্তু বাঁহাতি হারিস সোহেলকে দেখেই মনে হলো তাকেই মারতে হবে। রান করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। এই অনুভব ও উপলব্ধিই সম্ভাবনাময় ইনিংসটির সর্বনাশ ডেকে আনলো।

শান্ত, মুমিনুল, রিয়াদ আর লিটন উইকেট বিসর্জন দিলেও মোহাম্মদ মিঠুন চেষ্টা করেছেন উইকেটে থাকতে এবং দলকে এগিয়ে নিতে। তার পুরস্কারও পেয়েছেন। দলের ইনিংসের একমাত্র ফিফটি (১৪০ বলে ৬৩) মিঠুনের। নাসিম শাহর বলে গ্লাভসে লেগে কট বিহাইন্ড হবার আগেও মিঠুন চেষ্টা করেছেন উইকেটে থেকে রান করতে।

চল্লিশের ঘরে গিয়ে শান্ত, ৩০‘এ পা দেয়া মুমিনুল, মধ্য তিরিশে থাকা লিটন আর ২৫ ‘এ ভুল পথে হাঁটা রিয়াদের যেকোনো একজন সেঞ্চুরি করতে পারলে তো কথাই ছিল না, অন্তত দুজন পঞ্চাশে পা রাখলেও আরও ১০০ রান বেশি হতো। তখন আজ প্রথম দিনও ইনিংস শেষ হতো না। হয়তো কাল সকালে প্রথম সেশনটাও কাটিয়ে দেয়া যেত।

টেস্ট ক্রিকেট শুধু চটকদার, বাহারি মার, দৃষ্টিনন্দন স্ট্রোক প্লে আর তেড়েফুড়ে মারার খেলা না। কখনো রান করার পাশাপাশি উইকেটে টিকে থাকাও জরুরি। কারণ খেলাটা ৫ দিনের। সময়ক্ষেপনও টেস্টে ভাল খেলার একটা পূর্বশর্ত। উইকেটে বেশিক্ষণ থাকতে পারলে আলগা বল মিলবে বেশি। রান করার সুযোগও আসবে অনেক। তাতে যেমন নিজের রান বাড়বে, দলের স্কোরও বড় হবে। সে উপলব্ধিটা এখনো খুব কম টাইগারদের।

কে জানে, কবে হবে এ বোধোদয়?

Leave a Comment